সরকার নির্ধারিত যৌক্তিক বাজারদর থেকে অনেক দূরে প্রকৃত পণ্যমূল্য

নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ায় বিভিন্ন সময় অন্তত ৩৬টি পণ্যের ‘যৌক্তিক’ দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।

নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ায় বিভিন্ন সময় অন্তত ৩৬টি পণ্যের ‘যৌক্তিক’ দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। উৎপাদন ব্যয়, বিপণন, পরিবহন ও মুনাফা—সব হিসাব বিবেচনায় নিয়ে এ দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকার নির্ধারিত এ ‘যৌক্তিক’ দামের কোনো প্রতিফলন বাজারে দৃশ্যমান নয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত পণ্যমূল্য চলে যাচ্ছে অযৌক্তিক পর্যায়ে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু পণ্য সংকটের কারণে দাম বাড়ছে না। ব্যবসায়ীদের কারসাজিও একটি বড় কারণ। ফলে দাম নির্ধারণ করে দিয়েও সুফল মিলছে না।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পণ্যের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। আর দাম নির্ধারণ করতে হবে বাজারে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে।

সরকার প্রতি কেজি কাঁচামরিচের দাম নির্ধারণ করেছে ৬০ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ৩২০ টাকা কেজি দরে। একইভাবে সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বেশি টাকায় বিক্রি হচ্ছে ঢেঁড়স, পটোল, মিষ্টিকুমড়াসহ সব ধরনের সবজি।

নিত্যপণ্যের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সংস্থাটি প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করেছে ৬৫ টাকা। কিন্তু গতকাল কারওয়ান বাজারে তা বিক্রি হচ্ছিল ১১০ টাকা কেজি ধরে। একইভাবে চিচিঙ্গার কেজি ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। ৩২ টাকা কেজির মিষ্টিকুমড়া হয়ে গেছে ৭০ টাকা। ৪০ টাকার পটোল বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। আর ৩৬ টাকার ঢেঁড়স কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকা দিয়ে।

সবজির দামের এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করলেও বাজার মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারণ হয়ে থাকে। তবে বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দিলে কারসাজির সুযোগ বেড়ে যায়। তাই বাজারে নজরদারি জোরদার করতে হবে। তবে সাম্প্রতিক দুই দফা বন্যায় কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার শীতের আগের এ সময়ে সবজির সরবরাহও কম থাকে। এক মাসের মধ্যে শীতের সবজি এলে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বেঁধে দেয়া ৪০ টাকা কেজির ঝিঙ্গা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০-১০০ টাকায়। লম্বা বেগুনের নির্ধারিত দাম ৪৬ টাকা। তবে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ৭০-১০০ টাকায়। একইভাবে মোটা চালের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৪৩ টাকা ৮৬ পয়সা। তবে গতকাল তা বিক্রি হচ্ছিল ৫৫ টাকায়।

সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা গবেষকরা ভালো বলতে পারবেন।’ সম্ভাব্য করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক কিছুই করার আছে। আইনি পদক্ষেপ নেয়া য়ায়, পণ্য আমদানি করা যায়। আমরা সারা দেশে জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং করছি। বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য যাবতীয় কার্যক্রম আমরা করছি।’

গত মার্চে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে ২৯টি পণ্যের ‘যৌক্তিক’ দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়। পরের মাসে নির্ধারণ করে দেয়া হয় মানভেদে চালের দামও। এরপর গত জুনে আরো ছয়টি কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোক্তাবান্ধব না হয়ে ব্যবসায়ীবান্ধব পদ্ধতিতে সরকার যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করেছে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ভুল রয়েছে। তারা বড় কয়েকটি গ্রুপকে ডেকে দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু আমরা বলেছিলাম ছোট, মাঝারি উৎপাদনকারী, ভোক্তাদের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে যেন ডাকা হয়। তাহলে তাদের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষ জানতে পারত। কিন্তু তারা ব্যবসায়ীবান্ধব পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণ করার জন্য এটা করছে। পরবর্তী সময়ে কেন এটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এটা নিয়ে কোনো কার্যক্রম নেই।’

এদিকে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। জেলায় জেলায় সমন্বিত কমিটি গঠন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও মাঠে কর্মরত রয়েছে।

এদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে আড়তদারদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটি বলেছে, আড়তদারদের যোগসাজশে পাইকারি, ব্যাপারী ও খুচরা ব্যবসায়ী—সবাই একত্র হয়ে দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভোক্তা অধিদপ্তর জানায়, কারওয়ান বাজারে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন অবৈধ ফড়িয়া ব্যবসায়ী আছেন। তাদের কোনো ধরনের নিবন্ধন, রসিদ বই বা অন্য কোনো অনুমোদন নেই। অভিযানে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সবজির দাম বাড়াতে আড়তদারদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

আরও